আবুল কাসেম বিশেষ প্রতিনিধিঃ

সঙ্ঘবদ্ধ আন্তঃজেলা বাস ডাকাত দল কর্তৃক হোটেল ব্যবসায়ী লস্কর রবিউল ইসলাম (৪১)খুনের রহস্য উদঘাটন লস্কর রবিউল ইসলাম হত্যাকাণ্ডে জড়িত আন্তঃজেলা ডাকাত দলের দলনেতাসহ নয় সদস্যকে গ্রেপ্তার এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মামলার আলামত জব্দ করেছে পিবিআই
বাংলাদেশের অন্যতম বিশেষায়িত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআই সূচনা লগ্ন থেকেই অত্যন্ত সুনাম দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সাথে ডাকাতিসহ বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর’ অপরাধের মূল রহস্য উদঘাটন ও অপরাধীকে গ্রেফতার এর মাধ্যমে অপরাধ নির্মূল ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

এরই ধারাবাহিকতায় পিবিআই ঢাকা জেলা পুলিশ গত (৫) অক্টোবর তারিখে সংঘটিত হোটেল ব্যবসায়ী মোঃ লস্কর রবিউল ইসলাম (৪১) হত্যাকান্ডের রহস্য উদ্ঘাটন ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত আন্তঃজেলা ডাকাত দলের দলনেতাসহ ৯জনকে গ্রেপ্তার করেন, গত ৫ ই অক্টোবর ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার থানাধীন বলিয়াপুর যমুনা ন্যাচারাল পিকনিক স্পট এর গেটের পশ্চিমপাশর ঝোপের ভেতর থেকে রবিউল ইসলামের লাশ পড়ে থাকতে দেখে পথচারীরা পুলিশে খবর দেন। সংবাদ পেয়ে সাভার থানাধীন আমিনবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোহাম্মদ আব্দুস সবুর খান লাশ করে এবং লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন রিপোর্ট তৈরি করেন,এবং লাশের ময়নাতদন্তের জন্য সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল হাসপাতাল মর্গে প্রেরন করেন।

ঘটনা সম্পর্কে জানা যায় নিহত ব্যক্তির নাম লস্কর রবিউল ইসলাম (৪১) পিতা লস্কর মসলিম গ্রাম নড়াগাতি জেলা নড়াইল। বর্তমানে বাসা ৫/৭ মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স চিড়িয়াখানা রোড ঢাকা।
নিহত রবিউল ইসলাম একজন হোটেল ব্যবসায়ী দীর্ঘ দিন যাবত মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের সামনে খাবার হোটেল ব্যবসা করে আসছেন।

ঘটনার সূত্র –
নিহত রবিউল ইসলাম গত ৫ই অক্টোবর আনুমানিক সাড়ে তিনটার দিকে আশুলিয়া জামগড়া ভাগ্নের বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে যান মিরপুরের বাসা হইত। ঐদিন সন্ধ্যা আনুমানিক ছয় টার দিকে, তিনি তার ভাগিনা নাজমুল ইসলাম জুয়েল ও হাসিব বিশ্বাসের সাথে জামগড়া দেখা করেন, এবং কথাবাত্রা শেষে আশুলিয়া ইপিজেড এলাকায় ইসলামিয়া হোটেলের মালিকের সাথে দেখা করার কথা বলে রিকশা যোগে ইপিজেড এর উদ্দেশ্যে চলে যান। এরপর রাত আনুমানিক সাতটার দিকে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন দিয়ে তার স্ত্রীর মোবাইল নম্বরে ফোন করলে মৃত রবিউল ইসলামের মেয়ে হাবিবা তাকে বাসায় আসতে বলে আম্মু আমি বাসায় আসছি বলে ফোন রেখে দেন রবিউল ইসলাম। গত ৬ ই অক্টোবর রাত আনুমানিক ১২টার দিকে অজ্ঞাত ব্যক্তি রবিউল ইসলামের ফোন হইতে তার মায়ের মোবাইল নম্বরে ফোন করলে মা বলেন রবিউল তুই কই, তখন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি বলে এই মোবাইলের মালিক রবিউল খুন হয়েছে তার লাশ হেমায়েতপুরে রাখা হবে বলে ফোন কেটে দেয়। গত ৬ই অক্টোবর দিনে লোক মারফত মৃত রবিউল ইসলামের স্ত্রী হাফিজা বেগম সংবাদ পান সাভার থানা দিন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বলিয়াপুরে যমুনা ন্যাচারাল পিকনিক স্পট এর পশ্চিম পাশে ঢাকা আরিচা মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে ঝোপের ভিতর মৃত রবিউল ইসলামের লাশ পড়ে আছে। এবং লাশটি সোহরওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে নেওয়া হচ্ছে, নিহত রবিউল ইসলামের স্ত্রী তার দেবর ইমরানসহ হাসপাতাল মর্গে গিয়ে রবিউল ইসলামকে সনাক্ত করেন।

ওই দিনই সাভার মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা রুজু করেন দুষ্কৃতিকারিদের বিরুদ্ধে, মামলা নং(১৬) ৬/১০/২০ইং (৩০২) (২০১)৩৪ দঃবিঃ ধারায় মামলা দায়ের করেন তিনি।

পিবিআই নিজ উদ্যোগে মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করেন এবং উক্ত ইউনিটের কর্মরত এসআই (নিরস্ত্র) সালে ইমরানকে তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেন, এসআই মোঃ সালে ইমরান মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করেন এবং একটি শক্তিশালী টিম তৈরি করেন।

সাথে সাথে মাঠে নেমে পড়েন তিনি গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে জানতে পারেন ঘটনাটি একটি আন্তঃজেলা বাস ডাকাতির ঘটনা এবং বাসে ডাকাতির সময় হোটেল মালিক রবিউল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বিপিএম পিপিএম ডিআইজির বিচক্ষনমূলক নির্দেশনায়, মোহাম্মদ খোরশেদ আলম পিপিএম, পুলিশ সুপার পিবিআই ঢাকা জেলার নেতৃত্বে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই (নিরস্ত্র) মোহম্মদ সালে ইমরানসহ একটি চৌকস টিম গুরুত্ব সহকারে মামলাটির তদন্ত মাঠে নামেন।

শক্তিশালী গোয়েন্দা তৎপরতা এবং আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সঙ্ঘবদ্ধ ডাকাত দলের প্রধানকে গ্রেপ্তার করেন, প্রধান আসামি হলেন মোঃ বশির মোল্লা(৪২) পিতা-মৃত রিয়াজ উদ্দিন মোল্লা, গ্রাম আঙারিয়া থানা দুমকী জেলা-পটুয়াখালী, বর্তমান সাভার থানা স্ট্যান্ড রোড আব্বাস মেডিকেলের পাশের গলি। গত ১৩ই অক্টোবর আসামী বশির মোল্লাকে গ্রেফতার করেন। বসির মোল্লা একজন আন্তঃজেলা ডাকাত দলের দলনেতা বলে স্বীকার করেন তিনি।তিনিসহ তার দল বিভিন্ন বাসের ড্রাইভার ও হেলপারের কাজ করে আসছে দীর্ঘদিন যাবৎ, পাশাপাশি তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রুটের বাস ভাড়া নিয়ে তাতে স্টিকার পরিবর্তনসহ নতুন রং দিয়ে বিভিন্ন রুটের নাম লিখে তার দলবল নিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাস ডাকাতি করে আসছে দীর্ঘদিন যাবৎ বলে জানায়। তাদের মধ্যে কেউ ড্রাইভার কেউ কন্টাকটার কেউ হেল্পার এবং বাকিরা সবাই যাত্রী সেজে অভিনব কায়দায় রাস্তা থেকে যাত্রী তুলে বাসের মধ্যে তাদেরকে মারধর করে টাকা-পয়সা মোবাইলসহ মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নিয়ে চলন্ত বাস থেকে তাদেরকে রাস্তার নির্জন স্থানে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ফেলে দেয় বলে স্বীকার করেছে বশির মোল্লা।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ৪ ঠা অক্টোবর ডাকাতদল ঢাকা-টাঙ্গাইল রোডের চলমান নিরালা পরিবহনের একটি বাস ঢাকা মেট্রো ব১৪- ৭০২৯ গাড়িটি কুয়াকাটা যাওয়ার কথা বলে তিন দিনের জন্য রিজার্ভ নেন, উক্ত বাস নিয়ে মানিকগঞ্জসহ রাজবাড়ী জেলায় ডাকাতের কাজ শেষ করে ঢাকা ফেরার পথে ৫ই অক্টোবর আনুমানিক রাত ৮ টার সময় সাভার থানা নবীনগর থেকে নিহত লস্কর রবিউল ইসলামকে যাত্রী হিসেবে আসামিরা তাদের ব্যবহৃত বাসে উঠায়।

বাসের ভিতর ডাকাতি করার সময় নিহত রবিউল ইসলাম ডাকচিৎকার দিয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন এ সময় ডাকাত দলের সদস্যরা তাকে চেপে ধরে এবং ডাকাত দলনেতা মোহাম্মদ বসির মোল্লা বাসের ভিতরে থাকা উইলরেঞ্জ দিয়ে রবিউল ইসলামের অন্ডকোষে সজোরে আঘাত করলে রবিউল ইসলাম বাসের ভিতর নিহত হয়।

ডাকাত দলনেতা রবিউল ইসলামের মোবাইল ফোন দিয়ে নিহত রবিউল ইসলামের স্ত্রীকে ফোন করে বলে রবিউল ইসলাম খুন হয়েছে, এবং তাকে হেমায়েতপুরে ফেলে দেওয়া হবে বলে ছাপ জানিয়ে দেন এরপর মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে দেন ডাকাত দলনেতা গত ১৪ ই অক্টোবর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন এবং তার দুষ্কর্মের সহযোগীদের নাম উল্লেখ করেন, এবং ডাকাত দলের প্রধান মোঃ বশির উদ্দিনের স্বীকারোক্তি তথ্য অনুযায়ী সাভার-আশুলিয়া-ধামরাইয়ে ডেমরা সহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বাকি আট জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেফতারকৃত আসামিরা হলেন, (১) হাফেজ +৩৫) পিতা জাবেদ আলী শেখ মাতা পাখি বেগম, গ্রাম হাওড়া থানা ভাঙ্গা জেলা-ফরিদপুর, বর্তমান রায়েরবাগ যাত্রাবাড়ী মোখলেস মিয়ার বাড়ির ভাড়াটিয়া থানা কদমতলী ডিএমপি ঢাকা। (২) মোঃ আনোয়ার হোসেন (৩৫) পিতা নুরুল হক, মাতা বানু বেগম, থানা টঙ্গীবাড়ী জেলা মুন্সিগঞ্জ, বর্তমান মাতুয়াইল মেডিকেল মুসলিমনগর থানা ডেমরা ডিএমপি ঢাকা। (৩) আমির হোসেন (২৮) পিতা আব্দুল ওহাব মাতা মোসাম্মৎ আমেনা বেগম সাং কেলিয়া পশ্চিমপাড়া থানা ধামরাই জেলা ঢাকা। (৪) মোঃ আল-আমিন (২৮) পিতা মোঃ শাহ আলম গ্রাম বাজিগারখন্ড থানা জেলা বাগেরহাট। (৫) জুয়েল (৩২) পিতা জাহাঙ্গীর আলাম কারিগরপাড়া থানা আশুলিয়া জেলা ঢাকা। (৬) মোঃ নঈম (২২) পিতাঃ মোঃ হুমায়ুন কবির, ফতেহপুর, থানা সেনবাগ নোয়াখালী, বর্তমানে নয়ারহাট নবীনগর জেলা ঢাকা। ৭) তপন (২৮) পিতা সুভাষ মন্ডল থানা মির্জাপুর জেলা টাংগাইল।৮) নাজমুল(৩০) পিতা মোঃ লাল মিয়া সাং ষাটশালা থানার ঘাটাইল, জেলা টাঙ্গাইল।

ব্যবহৃত গাড়িটি ঢাকা-টাঙ্গাইল রোডের নিরালা পরিবহনের যাহার নং ঢাকা মেট্রো ব ১৪-৭০২৯ নং বাসটিকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আলামত হিসেবে জব্দ করেন পিবিআই। বসিরের দেওয়া তথ্যমতে পলাতক ডাকাত দলের,(১৩) সদস্যকে গ্রেফতারের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
আরো জানা যায় আটককৃত আসামিদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বিভিন্ন থানায় খুনসহ একাধিক মামলা রয়েছে।

নিহত রবিউল ইসলাম এর আপন ফুফাতো ভাই ট্রাফিক ইন্সপেক্টর সাইফুল ইসলাম লিটন পিবিআইকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিয়ে বলেন, আমার ভাইয়ের হত্যাকারীদের অল্প সময়ের মধ্যে যেভাবে পিবিআই আসামীদের গ্রেফতার করছেন।

আমি একজন পুলিশ সদস্য হয়ে বলতে পারি বাংলার মাটিতে আর কোনো খুন গুম অপহরন ধর্ষণকারীরা পালিয়ে বাঁচতে পারবে না, ৭০ হাত মাটির নিচে থাকলেও অপরাধীকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার জন্য পিবিআইয়ের জন্ম হয়েছে, বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন সংস্থা ও অর্গানাইজেশন অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিচক্ষনতার সাথে কাজ করে চলছেন, তাতে করে আর কোন অপরাধী অপরাধ করে পার পাবে না, অপরাধ করার আগে শতবার ভাবতে হবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরো বলেন, অপরাধীর একটাই ঠিকানা, হয় ফাঁসি, না হয় জেলখানা।
লস্কর রবিউল হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন হাওয়ায় নিহতের স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে এসেছে বলে জানান এলাকাবাসী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here