top news 24

অনলাইন ডেস্ক

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউক ১০ গুণ ফি নিয়ে অবৈধ ভবন বৈধ করতে চায়। সংশোধিত ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) বা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় এই সুপারিশ করা হয়েছে। সংশ্নিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। রাজউকের আওতায় রয়েছে রাজধানীসহ আশপাশের ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা।

ড্যাপ প্রণয়নের জন্য রাজউক এলাকাভুক্ত নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় বিদ্যমান স্থাপনার ওপর জরিপ পরিচালনা করা হয় ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত। সেই জরিপে দেখা যায়, এসব এলাকায় ২০ লাখ ৬০ হাজার ১৬০টি অনুমোদনহীন ভবন রয়েছে। প্রতি বছর এখানে অবৈধ নতুন ভবন হচ্ছে ৯০ হাজার ৫৬৪টি করে। তবে এই জরিপের তথ্য রাজউক এখনও প্রকাশ করেনি।

জরিপে বলা হয়েছে, রাজউক এলাকায় বর্তমানে মোট ২১ লাখ ৪৫ হাজার ৭৪৬ স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে ২০ লাখ ৬০ হাজার ১৬০টি স্থাপনার রাজউক অনুমোদিত নকশা নেই। অর্থাৎ মোট স্থাপনার ৯৬ ভাগই অবৈধ। অনুমোদিত নকশা আছে মাত্র ৮৫ হাজার ৫৮৬টি স্থাপনার। এই বিপুল সংখ্যক অনুমোদনহীন স্থাপনার বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে সে ব্যাপারে হিমশিম খাচ্ছিল রাজউক। এ পর্যায়ে ড্যাপ প্রণয়নকারীরা উপরোক্ত সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে।

একাধিক ভবন মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা জানেনই না, স্থাপনা তৈরি করতে রাজউকের অনুমোদন নিতে হয়। যারা জানেন, তাদের মধ্যেও অধিকাংশই অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না। এভাবেই প্রতি বছর রাজধানী ও এর আশপাশে হাজার হাজার অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠছে। এসবের মধ্যে একতলা-দোতলা ভবনের সংখ্যাই বেশি। তবে পাঁচ থেকে সাততলা ভবনও রয়েছে এরমধ্যে। যে ৪ শতাংশ স্থাপনা রাজউকের অনুমোদন নিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে, সেগুলোরও নকশা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। কেউ সামনে বা পেছনে ভবনের পরিধি বাড়িয়েছেন। কেউ সেটব্যাক বা প্রয়োজনীয় উন্মুক্ত স্থান রাখেননি। কেউ পার্কিংস্থলে কক্ষ, দোকানপাট, গুদামঘর নির্মাণ করেছেন, যা অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ।

রাজউকের বোর্ড সদস্য (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) শফি উল হক সমকালকে বলেন, যেসব ভবন নকশা ছাড়া গড়ে উঠেছে, সেগুলোর মান পরীক্ষা করে জরিমানা আদায় সাপেক্ষে সীমিত পরিসরে রাজউক বৈধতা দিয়ে থাকে। অন্যগুলো অপসারণ করে। এবার এসব অনুমোদনহীন স্থাপনার ব্যাপারে ড্যাপ সুপারিশ দিয়েছে। সেই আলোকে রাজউক ব্যবস্থা নেবে।

ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম জানান, এই বিপুল সংখ্যক স্থাপনা অপসারণ করা সম্ভব নয়। এগুলো ভেঙে ফেলাও অসম্ভব। ভবনগুলোর সঙ্গে হাজার হাজার মানুষের আর্থিক, বাণিজ্যিকসহ নানা সম্পর্ক রয়েছে। এ জন্য ড্যাপে সুপারিশ থাকছে জরিমানার পরিমাণ বাড়িয়ে সেগুলোর বৈধতা দেওয়ার।

ড্যাপ প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত নগর পরিকল্পনাবিদ হিশাম উদ্দিন চিশতি বলেন, একটি স্থাপনা তৈরির সময় রাজউক থেকে অনুমোদন নিতে যে ফি দিতে হয়, সংশোধিত ড্যাপে এই ফির ১০ গুণ জরিমানা আদায় সাপেক্ষে সেগুলোর বৈধতা দেওয়ার প্রস্তাব ড্যাপে রাখা হয়েছে। যেসব ভবন নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণ করে তৈরি হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক নগর পরিকল্পনাবিদ আকতার মাহমুদ বলেন, এখানে দুটি দিক আছে। একটি হলো, এগুলোকে যদি আইনের আওতায় না আনা হয় তাহলে সেগুলো অবৈধই থেকে যাবে। আবার বৈধতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে অবৈধ বাড়িঘর তৈরির ব্যাপারে অনেকে উৎসাহিত হবে। তারা একটি সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে। তারা মনে করবে, এভাবে অবৈধভাবে তৈরি করলে তো পরে বৈধতা পাওয়া যাবেই। ফলে অবৈধভাবে ঘরবাড়ি তৈরির প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে। কাজেই বিষয়টি আরও ব্যাপক পরিসরে পর্যালোচনা করা দরকার। প্রয়োজনে করণীয় নির্ধারণে আইনবিদদের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

এদিকে জরিপ তথ্যে দেখা গেছে, এসব স্থাপনার মধ্যে ৭৬ শতাংশই সেমিপাকা ও কাঁচা। এগুলো সব একতলা। বাকিগুলো পাকা। পাকাগুলোর মধ্যে দোতলা থেকে শুরু করে সাততলা ভবনও রয়েছে।

১৯৯৫ সালে প্রণীত ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানে (ডিএমডিপি) বলা হয়েছিল, দোতলা পর্যন্ত বা ২ কাঠার চেয়ে কম আয়তনের যেসব প্লটে আবাসিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে, সেগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা যেতে পারে। এ ধরনের স্থাপনার অনুমোদন নিতে হলে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র নেওয়ারও বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয় ডিএমডিপিতে। কিন্তু আগের ড্যাপে বলা হয়েছিল, এ ধরনের স্থাপনাকে বৈধতা দিতে হলে তিন গুণ জরিমানা দিয়ে স্থাপনার মালিক বৈধতা নিতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে ওই স্থাপনার নকশার অনুমোদন নিতে রাজউকে যে ফি দিতে হতো, জরিমানা পরিমাণ হবে ওই ফির তিন গুণ। এবারের সংশোধিত ড্যাপে প্রস্তাব করা হয়েছে ১০ গুণ। পাশাপাশি ভবনের সক্ষমতা পরীক্ষার কথাও বলা হয়েছে। যেসব ভবনের টিকে থাকার সক্ষমতা আছে, নির্মাণশৈলী ও মান সন্তোষজনক, সেগুলোকেই জরিমানার মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত জরিমানা আরোপের কারণে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে ভূমি মালিকরা সতর্ক থাকবেন।

সংশোধিত ড্যাপে প্রস্তাব করা হয়েছে, আদায়কৃত ১০ গুণ ফি বা জরিমানার অর্থ সংশ্নিষ্ট এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নসহ নাগরিক সুবিধা দেওয়ার জন্য ব্যয় করা হবে, যা পরিকল্পিত নগরায়ণে সহায়ক হবে। এদিকে ২০০৮ সালের ডিএমডিপিতে আগে বলা হয়েছিল, অনুমোদনহীন স্থাপনার বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই। এগুলো অপসারণ করতে হবে। জরিমানার মাধ্যমে বৈধকরণের সুযোগ দিলে শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, অতীতে তিন গুণ জরিমানা দিয়ে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ থাকলেও সেই জরিমানা স্বেচ্ছায় দিয়ে বৈধতা নেওয়ার নজির তেমন নেই। বৈধতা না থাকায় বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে সেগুলোর দু-চারটি অপসারণও করেছে রাজউক। বাকিগুলো বহাল তবিয়তে টিকে আছে। ফলে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় অপরিকল্পিত নগরায়ণ বাড়ছে। আর নকশা অনুমোদন না করে একের পর এক স্থাপনা গড়ে ওঠার কারণে ঝুঁকির মাত্রাও বাড়ছে। এসব স্থাপনায় দুর্ঘটনা ঘটে মাঝেমধ্যেই প্রাণহানির ঘটনাও বাড়ছে। পরিকল্পিত নগরীর পরিবর্তে নতুন এলাকাতেও অপরিকল্পিত ভবন তৈরি হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here