top news 24

রাজধানী প্রতিনিধি

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আবুল বাশার শরীফ বেঞ্চ সহকারী পদে কাজ করেন। সাধারণত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যখন কোনো ফাইলে সই করেন, তখন তিনি ওই ফাইলগুলো এগিয়ে দিয়ে থাকেন। এ কাজ করার পাশাপাশি তিনি রাজউকে কিছু বড় ধরনের ‘অকাজ’ও করেন। এই ফাইলগুলো থাকে তার নখদর্পণে। ফলে বিভিন্ন প্লটের ফাইল গায়েব করে রাখেন। ওই প্লটের মালিকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে ফাইলের সন্ধান দেন। ঘুষ না দিলে ওই ফাইলের হদিস মেলে না। কখনও কখনও সেসব প্লটের ভুয়া মালিক সাজিয়ে একজনের প্লট আরেকজনের কাছে বিক্রিও করে দেন। প্লটের অবস্থান পরিবর্তন এবং আকার বৃদ্ধি করার ‘দালালি’ করেও ঘুষ নেন তিনি। এ রকম অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অবশ্য এ ‘অকাজ’ তিনি একাই করেন না; সঙ্গে রয়েছে একটি চক্র। সম্প্রতি এই বেঞ্চ সহকারী বাশার শরীফের বিরুদ্ধে ফাইল গায়েবের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করেছে রাজউক প্রশাসন। বিভাগীয় মামলা হলে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করার নিয়ম থাকলেও তার ক্ষেত্রে সেটা অনুসরণ করা হয়নি। ফলে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন সামান্য চাকুরে এই বাশার শরীফ। এসব করে তিনি বিত্তবৈভবের মালিকও হয়েছেন। বিপরীতে ফাইল গায়েবের কারণে সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রাজউকের প্লট মালিকরা। রাজউক সূত্রে জানা গেছে, রাজউকে ফাইল গায়েবের ঘটনা নতুন নয়। বিভিন্ন সময় অসংখ্য ফাইল গায়েবের ঘটনা ঘটেছে। যেসব ভবনের নকশায় ‘ঝামেলা’ থাকে, সেসব ফাইল বেশি গায়েবের ঘটনা ঘটে। বনানীতে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এফআর টাওয়ারের ফাইলও গায়েব হয়েছিল। ফাইল গায়েবের একটি বড় চক্র গড়ে উঠেছে রাজউকে। যে কারণে মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন প্লটের ফাইল হাওয়া হয়ে যায়। আর এ চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাশার শরীফ।
রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফাইল গায়েবের সঙ্গে যুক্ত চক্রটি এমন কিছু প্লটকে টার্গেট করে, যে প্লটগুলোর মালিক দীর্ঘদিন ধরে এর খোঁজখবর নেন না। বিশেষ করে প্রবাসী কোটায় যারা প্লট পান, তারা প্লটের খবর বেশি রাখতে পারেন না। সেসব প্লটকেই টার্গেট করে ‘গায়েবি চক্র’। অধিকাংশ সময় দেখা যায়, প্রবাসী কোনো ব্যক্তি দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরলেন। তার প্লটের খবর নিতে রাজউকে গেলেন। তখনই জানতে পারলেন, তার ফাইল গায়েব। তখন চোখে অন্ধকার দেখা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। যত টাকা লাগুক, ফাইল পাওয়া তার কাছে তখন মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। এদিকে ‘গায়েবি চক্র’ ওত পেতে থাকে। তার আশপাশেই ঘুরতে থাকে। বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রফা হয়। ফাইলেরও হদিস মেলে একসময়। লন্ডনের ২৩-এ হেনজি স্ট্রিটে বসবাসরত চাঁদপুরের মতলব থানার ইমামপুর
গ্রামের ছমির উদ্দিন মোল্লার ছেলে আবুল বাশার এ প্রতিবেদককে জানান, পূর্বাচলে তিনি পাঁচ কাঠার একটি প্লট বরাদ্দ পেয়েছিলেন। সব অর্থও তিনি পরিশোধ করেন। তার নামে বরাদ্দ করা হয় ৩০ নম্বর সেক্টরের ৩০৩ নম্বর রোডের ২২ নম্বর কর্নার প্লট। খুবই ভালো স্থানে। প্লটটি বুঝে নিতে চাইলে ওই ‘গায়েবি চক্র’ বলে, তাকে ওই প্লটটি দেওয়া যাবে না। পরে ৩০১ নম্বর রোডের ২২ নম্বর প্লটটি দেওয়ার কথা বলা হয়। এই প্লটটি অনেক ভেতরে। ভালো লোকেশনে না। ঝামেলা এড়াতে প্রবাসী ওই প্লটটিই বুঝে নিতে চান। এবার বলা হয়, এটিও দেওয়া যাবে না। কারণ, ওই সড়কের ৩২ নম্বর প্লটের বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তির নামে ওই ২২ নম্বর প্লটটি রেজিস্ট্রি বা নিবন্ধন হয়ে গেছে। আর ৩২ নম্বর প্লটটিও আরেকজনের নামে রেজিস্ট্রি হয়ে গেছে। একপর্যায়ে ওই প্রবাসীকে একই সড়কের ১২ নম্বর প্লটটি দেওয়ার কথা বলা হয়। এ পর্যায়ে প্রবাসী এই ১২ নম্বর প্লটটিই রেজিস্ট্রি করে নিতে চাইলেন। রেজিস্ট্রির সময় স্বাভাবিকভাবে সব নথি প্রয়োজন হয়। শুরু হলো নথি তল্লাশি। এবার ওই প্রবাসীকে রাজউকের চক্র জানাল, তার প্লট পাওয়ার কোনো ফাইলই রাজউকে নেই। প্রকৃতপক্ষে ফাইল রাজউকেই আছে; কিন্তু মোটা অঙ্কের ঘুষ খাওয়ার জন্য তাকে হয়রানি করা হয়। এরপর ওই প্রবাসী বাশার শরীফের কাছে যান। ফের মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তিনি ফাইলটি ফেরত পান। তখন বলা হয়, ১২ নম্বর প্লটটিও আরেকজনের নামে রেজিস্ট্রি হয়ে গেছে। তাহলে কোথায় তাকে প্লট দেওয়া হবে। সে ব্যাপারে কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, এখন আর কোনো প্লট দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, কোনো প্লট ফাঁকা নেই। এভাবে গত ১৭ বছরে কাজ বাদ দিয়ে তাকে প্রায় ২৫ বার দেশে আসতে হয়েছে। কিন্তু প্লটটি আজও বুঝে পাননি লন্ডনপ্রবাসী আবুল বাশার।
শুধু আবুল বাশারই নন, এ রকম আরও অনেকেই বছরের পর বছর রাজউকের এই চক্রের হাতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন; কিন্তু কোনো সমাধান মিলছে না।
আরও একজন হতভাগ্য যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ওয়াজেদ আলী খান। তার ক্ষেত্রেও প্রায় একই ঘটনা। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি শয্যাশায়ী। কিন্তু পূর্বাচলে পাওয়া ১৪ নম্বর সেক্টরের ৩০৫ নম্বর রোডের ১০ নম্বর প্লটটি তার নিকটাত্মীয়কে দলিল করে দিতে পারছেন না বলে এ প্রতিবেদককে জানান ওয়াজেদ আলী খানের এক নিকটাত্মীয়। জানা যায়, তার ফাইলও গায়েব হয়ে গেছে। যাই হোক, বেঞ্চ সহকারী বাশার শরীফকে ঘুষ দিয়ে সেই ফাইল উদ্ধার করা হয়। কিন্তু প্লট রেজিস্ট্রি করার সময় কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা হয় নতুন সমস্যা। এই সমস্যা হলো ওয়াজেদ আলী খানের সই মিলছে না। সই না মেলার মূল কারণ হলো তিনি অনেকটা শয্যাশায়ী। হাত কাঁপে। ঠিকমতো সই এখন করতে পারেন না। সর্বশেষ জানা গেছে, প্লটটি এখনও তার আত্মীয়কে লিখে দিয়ে যেতে পারেননি।
জানা গেছে, ২০১৯ সালের ৫ মে বর্তমান বিদ্যুৎ সচিব সুলতান আহমেদ রাজউকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকেই তার কাছে একের পর এক ফাইল গায়েবের অভিযোগ জমা পড়তে থাকে। একপর্যায়ে গত বছরের ১৫ অক্টোবর সাহসী কর্মকর্তা সুলতান আহমেদ নিজে দু’জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে অভিযান চালান। রাজউকের পেছনের বর্ধিতাংশ ভবনের কয়েকটি কক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের গায়েব হওয়া মোট ৭২টি প্লটের ফাইল উদ্ধার করেন। এ সময় গায়েবি চক্রের সদস্য বাশার শরীফ, গোল্ডেন মনিরসহ অন্যরা পালিয়ে যান। রাজউকের অফিস সহায়ক পারভেজকে আটক করে পুলিশ।
রাজউক কর্মচারীরা জানান, বর্ধিতাংশ ভবনের একটি কক্ষ অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক কমিশনার আবদুল কাইয়ুম ভাড়া নিয়েছিলেন। ওই কক্ষ থেকে কিছু ফাইল উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া রাজউক শ্রমিক লীগের কক্ষ থেকে আরও কিছু ফাইল পাওয়া যায়। গোল্ডেন মনির নামের এক দালাল রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশ করে বিভিন্ন প্লটের ফাইল নিয়ে ওই কক্ষে রাখতেন। ওই কক্ষেই প্লট বেচাকেনাসহ গায়েব হওয়া ফাইল ফিরিয়ে দেওয়া-সংক্রান্ত কাজের দেনদরবার হতো। অভিযানকালে বাশার শরীফসহ তার সহযোগীরা পালিয়ে যান।
পরে বাশার শরীফের কাছ থেকে আরও তিনটি ফাইল উদ্ধার হয়। দুটি ফাইলের ব্যাপারে তিনি নানা যুক্তি উপস্থাপন করেন। ফাইল তার কাছে রাখার কারণ ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু ২০১৬ সাল থেকে পূর্বাচল প্রকল্পের এক প্রবাসীর ফাইলের ব্যাপারে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি বাশার শরীফ।
এ ঘটনায় রাজউক তদন্ত করে দেখতে পায়, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ১৮ নম্বর সেক্টরের ৪০২ নম্বর সড়কের ৯ নম্বর প্লটের ফাইলটি ২০১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি হারিয়ে যায়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ফাইল নথি উপস্থাপনকারী সাইফুল্লাহ চৌধুরীর দপ্তর থেকে ২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর পর্যন্ত বাশার শরীফ তার কাছে রেখে দেন। রাজউক কর্মকর্তা ও কর্মচারী চাকরি বিধিমালার ২০১৩-এর ৩৭(চ) অনুযায়ী বিষয়টি চুরি বা প্রতারণার শামিল। এ কারণে তাকে চুরি বা প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হলো। পরে গত ৩ সেপ্টেম্বর রাজউক বাশার শরীফের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা (নং ১০/২০২০) দায়ের করা হয়।
রাজউকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অভিযানের পর যেসব কক্ষ থেকে গায়েব হওয়া ফাইল উদ্ধার করা হয়েছিল, শ্রমিক লীগের কক্ষ ছাড়া বাকি কক্ষগুলো সিল করে দেওয়া হয়। পরে চক্রটি কাকরাইল ও বিজয়নগরের দুটি হোটেলে আস্তানা গেড়েছে। এ চক্রের সঙ্গে রয়েছেন রাজউকের অফিস সহকারী, বেঞ্চ সহকারী, উচ্চমান সহকারীসহ কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা। বহিরাগতদের মধ্যে রয়েছেন ফরিদ, মসিউর, শরীফ, নাদেরসহ আরও কয়েকজন। গোল্ডেন মনির আগে এ চক্রের অন্যতম সদস্য থাকলেও অভিযানের পর রাজউকে নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। বর্তমানে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণে তৎপর হয়ে উঠেছেন বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে রাজউকের বর্তমান চেয়ারম্যান সাঈদ নূর আলম বলেন, যারা এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত, রাজউক তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। একজন ফাইল গায়েবের ঘটনায় জেলে আছে। বাশার শরীফের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় মামলা দায়ের হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
জানতে চাইলে বেঞ্চ সহকারী বাশার শরীফ সমকালকে জানান, যেটা বড় গাছ, সেটার গায়ে বাতাস একটু বেশিই লাগে। যারা এসব কাজ করে, তাদের নামের সঙ্গে তাকে জড়ানো হয়েছে। তিনি কখনোই এসব কাজের সঙ্গে যুক্ত নন; বরং যারা এসব কাজ করেন, তাদের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার। আর বিভাগীয় মামলা যেটা হয়েছে, সেটা অন্য ধরনের বিভাগীয় মামলা। এ মামলায় বরখাস্ত করার প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here