টপ নিউজ 24

মিরপুর প্রতিনিধি

গ্যাং লিডার হিসাবে নাম আছে এমন কিশোরদের অনেকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। নেই স্থায়ী ঠিকানা। বেশ কয়েকজন রীতিমতো বখাটে বস্তিবাসী। ছিন্নমূল কিশোরদের অনেকে ইতোমধ্যে হাত পাকিয়েছে ছিনতাই-চাঁদাবাজিতে।

পেশাদার অপরাধী হিসাবেও তালিকাভুক্ত অনেকে। কেউ কেউ জমি দখল বা মারামারিতে রীতিমতো ভাড়া খাটে।

রাজনৈতিক পেশিশক্তির ঢাল হিসাবেও এদের ব্যবহার করা হয়। সংগত কারণে এদের আশ্রয়প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন এলাকার প্রভাবশালী কিছু রাজনৈতিক নেতা। এসব কিশোর গ্যাং সদস্যের উৎপাত আর দাপটে মিরপুরবাসীর অনেকের ঘুম হারাম। অনেকে জিম্মি হয়ে আছেন এদের কাছে।

পুলিশের তালিকা, মতামত এবং সরেজমিন অনুসন্ধান বিশ্লেষণ করে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে। তালিকা অনুযায়ী ৭টি থানা এলাকায় কিশোর গ্যাং ২৩টি। এদের সদস্যসংখ্যা পাঁচ শতাধিক। গ্যাং লিডারসহ বেশির ভাগের বয়স ১৮ থেকে ২২ বছর।

প্রতিটি গ্যাংয়ের পেছনের মদদদাতা রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা। এছাড়া নাম আছে স্থানীয় দাগি মাস্তানদেরও। পুলিশের তালিকায় পৃষ্ঠপোষক হিসাবে যাদের নাম আছে তারা হলেন-সন্ত্রাসী দাদা রিপন, ১১নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহ মোহাম্মদ কিবরিয়া ওরফে পিয়াস, ১২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন তিতু, দারুসসালাম থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজেদুর রহমান, ১০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি সাইদুর রহমান বাপ্পী, ওয়ার্ড কমিশনার তাহেরের ভাই রায়হান, পল্লবী থানা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিলন ঢালী, ৯১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের কর্মী ফারুক হোসেন এবং নুর ইসলাম, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সদস্য সুলতান, ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান, বিহারি ক্যাম্পের চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন বন্টু, ৫ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাঈম এবং শাহ আলী থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক তোফাজ্জল হোসেন সেন্টু।

কল্যাণপুর নতুনবাজার এবং ১১ নম্বর ওয়ার্ডে আধিপত্য রয়েছে আব্বাস গ্রুপের। এর সদস্যরা এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক ব্যবসায় জড়িত। লিডারের নাম আব্বাস আলী। পিতার নাম খোকন। ঠিকানা পোড়া বস্তির ৭ নম্বর গলি। আব্বাস গ্রুপের সদস্যরা হলেন লিটন ওরফে হোন্ডা চোরা লিটন ওরফে দাঁতভাঙা লিটন, তাজ উদ্দিন ওরফে তাজু, তানজিল, আরিফ ও রাকিব।

পোড়া বস্তি এলাকায় সক্রিয় নাডা ইসমাইল গ্রুপ। লিডারের নাম ইসমাইল ওরফে বাংলা। তার বাবার নাম কামাল। ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং ইভটিজিংয়ে জড়িত নাডা ইসমাইল গ্রুপ। সদস্যসংখ্যা ৮/৯ জন। এর মধ্যে কাওছার ও নূর আলম পুলিশের তালিকাভুক্ত।

৬০ ফিট মসজিদ ও দক্ষিণ পীরেরবাগ এলাকায় সক্রিয় হ্যাপি গ্রুপ। লিডারের নাম আবির হোসেন হ্যাপি। তার বাবার নাম আবুল হোসেন। বড়বাগ পলি ভিটামোড় এলাকায় তার বাসা। হ্যাপি গ্রুপের সদস্যসংখ্যা ২০ জন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন রুবেল, জাকির, আসাদ ও শান্তি গলির বেলাল হোসেনের ছেলে সাগর।

এদের সবাই ছিনতাই ও মাদক ব্যবসায় জড়িত হিসাবে পুলিশের তালিকাভুক্ত। কল্যাণপুর পোড়া বস্তি এলাকায় সক্রিয় বগা হৃদয় গ্রুপ। সদস্যসংখ্যা ৫/৭ জন। হৃদয় ওরফে বগার নাম অনুসারে গ্রুপের নামকরণ হয়েছে। সদস্যরা হলেন নতুন বাজার ৫ নম্বর বস্তির ফালানের ছেলে নীরব, ২নং পোড়া বস্তির বিল্লাল মিয়ার ছেলে ফয়সাল, সেলিমের ছেলে শাওন এবং দাদনের পুত্র নূর নবী।

দারুসসালাম থানা : লাল কুঠি তৃতীয় কলোনি এলাকার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে স্থানীয় কিশোর গ্যাং এলকে ডেভিল বা এলকে তালতলা বয়েজ গ্রুপের হাতে। গ্যাং লিডারের নাম রাব্বি। গ্রুপের সদস্যসংখ্যা ১৫/২০ জন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য লালকুঠি তৃতীয় কলোনির বাসিন্দা জুয়েল ওরফে ব্যাকা জুয়েলের ছেলে অভি, কাজল চৌধুরীর ছেলে শাহরিয়ার মাহমুদ সানাম, দারুসসালাম বি-ব্লকের রহন আলীর ছেলে শাকিল, সোহেলের ছেলে তানিফ খান, বড় মসজিদের পেছন গলির বাসিন্দা এখলাস উদ্দিনের ছেলে পাইটু, রাইয়ান আহম্মেদ রিজন ও রাফসান।

অতুল গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ইব্রাহিমনামা, মতিননামা, তিনতলা মসজিদ ও এর আশপাশের এলাকা। গ্রুপ লিডারের নাম শফিকুর ইসলাম ওরফে অতুল। তার বাবার নাম মজিবুর রহমান বাবুল। গ্রুপের সদস্যসংখ্যা ২৫/৩০ জন। বেশির ভাগ সদস্যের বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।

তুচ্ছ কারণে এলাকায় মারধর এবং হট্টগোলে জড়িয়ে পড়ে অতুল গ্রুপের সদস্যরা। তাদের অনেকে মাদক ব্যবসায় এবং ছিনতাইয়ে জড়িত। পুলিশের তালিকায় ১৫ জন সদস্যের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন সেন্টু মিয়ার ছেলে শান্ত। তার বিরুদ্ধে দারুসসালাম থানায় এক ডজনেরও বেশি মামলা আছে।

বসুপাড়ার বাসিন্দা ফারুক মিয়ার ছেলে মো. কাউছার। তার বিরুদ্ধে আছে মারামারির মামলা। এফ-ব্লকের ২নং রোডের বাসিন্দা দেলু মিয়ার ছেলে রাকিব, উত্তরপাড়া বাগবাড়ির বাসিন্দা শুকুর আলীর ছেলে সম্রাট, এসকে আনিছ, শাহ আলম, বসুপাড়ার বাসিন্দা সোবহানের ছেলে মিন্টু মিয়া, দেলোয়ার হোসেনের ছেলে রাহিতুল হাসান রিংকু, শেখ তৈয়বুর রহমানের ছেলে রিয়াজুল ইসলাম রিয়াজ, খোকন মিয়ার ছেলে সুমন, বসুপাড়ার মজিবুরের ছেলে আলামিন, ফজলুর ছেলে রনি, অরিন ইবনে রানা ও আহম্মেদ বাদল।

পল্লবী থানা : পল্লবী এলাকায় ৭টি সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের তালিকা করেছে পুলিশ। এর মধ্যে এক নম্বরে আছে আশিক গ্রুপের নাম। লিডার আশিকের নাম অনুসারে গ্রুপের নামকরণ করা হয়। আশিকের বাবার নাম মৃত নাদিম। পুলিশের খাতায় গ্রুপের ১২/১৩ জন সদস্যের নাম আছে। তারা হলেন শামীম, রায়হান, আল-আমিন, দাদু (বর্তমানে নিষ্ক্রিয়), রাব্বি, রনি, মহিন ও সুমন। এলাকার বেশ কয়েকটি জায়গায় দলবদ্ধভাবে আশিক গ্রুপের সদস্যদের আড্ডারত অবস্থায় দেখা যায়। এর মধ্যে তালতলা মোড়, নাভানা আবাসিক ভবনের সামনে ও সবুজ বাংলা আবাসিক গেটের সামনে বিকাল ৫টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত কেউ কেউ অবস্থান করেন। পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী আশিক গ্রুপের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক পল্লবী থানা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিলন ঢালী।

১১ নম্বর সেকশনের ডি-ব্লক এবং রামগড় এলাকায় সক্রিয় জল্লা মিলন গ্রুপ। লিডারের নাম বিহারি মিলন। পুলিশের খাতায় গ্রুপের ১০/১২ জন সদস্যের নাম রয়েছে। তারা হলেন রামগড় ক্যাম্পের নাছিমের ছেলে সুমন, হানিফের ছেলে ফয়সাল, ডি-ব্লকের পাভেল, ২৭ নম্বর লাইনের এখলাসের ছেলে সানজু, বেছু মিয়ার ছেলে হায়দার ও রাজু।

এদের বিরুদ্ধে এলাকায় মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, ফিটিং এবং আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। বি-ব্লক, ঈদগাহ মাঠের পশ্চিম পাশে মাদকসেবন ও ছিনতাইয়ে জড়িত পিন্টু-কাল্লু গ্রুপ। তাদের সদস্যসংখ্যা ১৫/২০ জন। তবে গ্রুপ লিডারসহ ৮ জনকে তালিকাভুক্ত করেছে পুলিশ। তারা হলেন বাউনিয়া বাঁধ বি-ব্লকের কাল্লু, ‘ডি’ ব্লকের উজ্জ্বল, সজিব, সাজ্জাদ, শুক্কুর, ‘ই’ ব্লকের চুন্নুর ছেলে জনছু এবং ‘এ’ ব্লকের আলমগীরের ছেলে হাসান। পিন্টু কাল্লু গ্রুপের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক হিসাবে দুজনের নাম আছে। তাদের একজন হলেন ৫নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি খলিলুর রহমান এবং অপরজন ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সদস্য সুলতান।

এরা হলেন শরীফ ওরফে ধাসা শরীফ, রিয়াজ, জুয়েল ও সজিব। এই গ্রুপের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক ৫নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাঈম। ১২ নম্বর সেকশনের বি-ব্লক, বিয়ে বাড়ি কমিউনিটি সেন্টার ও আশপাশের এলাকায় সক্রিয় রকি গ্রুপ। এর নেতৃত্বে রয়েছেন বি-ব্লকের ৪/৬নং রোডের বাসিন্দা শাহজাহানের ছেলে রকি।

গ্রুপ লিডার সোহেল ছাড়া অন্যরা হলেন বাগানবাড়ি বস্তির মানিকের ছেলে জয়, রবিলালের ছেলে আদ্বিপ, হোসেনের ছেলে শুকুর এবং হারুন ফকিরের ছেলে রাকিব। এছাড়া তালিকাভুক্ত অপর একটি কিশোর গ্যাংয়ের নাম মিছা গ্রুপ। এদের সদস্যসংখ্যা ৫/৭ জন। এদের মধ্যে রাসেল, সুমন ও জুয়েলের নাম আছে পুলিশের খাতায়। গ্রুপের বেশির ভাগ সদস্য ছাত্র। তবে তাদের বিরুদ্ধে ইভটিজিংয়ের অভিযোগ রয়েছে।

রূপনগর আবাসিক এলাকায় সক্রিয় ইমন গ্রুপ। লিডারের নাম ইমন। গ্রুপের ৭ সদস্যের নাম আছে পুলিশের খাতায়। তারা হলেন সাইফুল ইসলাম লিমন, সেলিম ওরফে ডন সেলিম, তায়েব, তোতা, তুষার ও তপু। তাদের প্রায় সবার বিরুদ্ধে মারামারি, মাদক ব্যবসা এবং ফিটিংবাজির অভিযোগ রয়েছে। গ্রুপের বড় ভাই বা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক হলেন ৬নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের কর্মী সুমন মোল্লা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here