আসলেই কি আমাদের দেশ সম্ভাবনার?

বিশেষ প্রতিনিধি : 

আসলেই কি আমাদের দেশ সম্ভাবনার? আসুন একটি গল্প থেকেই শুনি। কোনো বানোয়াট কাহিনি নয়। গাজীপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ও জাপানের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল এঞ্জেল অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত এক সেমিনারে এসেছিলেন জাপানের Matsushita Institute-এর পরিচালক আকিরা জুকো। জুকোর মুখেই শোনা যাক পজিটিভ বাংলাদেশের কথা। সেমিনারে আকিরা জুকো বলছিলেন, ‘শুভ দিন। আমি তিন বছর পর বাংলাদেশে এসেছি। এবার চতুর্থবার। শুধু আমি নই। আমার স্ত্রী, বন্ধু-বান্ধব এমনকি জাপানের তরুণ-তরুণীরাও একসঙ্গে এ দেশে এসেছে। সেই সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ছে। এবার আমার সঙ্গী হয়েছেন ২৫ জন। আমাদের বাংলাদেশ সম্বন্ধে দৃঢ় আগ্রহ রয়েছে। এ দেশের উন্নয়নের জন্য আমরা জাপানিরা কী করতে পারি বা কী করলে বাংলাদেশের জন্য উপযুক্ত কাজ হবে তা বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে চিন্তা করার জন্যই আমাদের বাংলাদেশে আগমন। আপনারা জানেন, পৃথিবীর দ্রুত শিল্পোন্নত দেশ হিসেবে পরিচিত জাপান। জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করলে দেখা যাবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক পিছিয়ে আছে। কিন্তু অতীত ইতিহাসের দিকে পেছন ফিরে তাকালে গত ৭০ বছর আগে জাপানও অতিদরিদ্র অর্থনৈতিক অবস্থানে ছিল। আমার শৈশবের কথা চিন্তা করলে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার সঙ্গে বেশ সাদৃশ্য খুঁজে পাই। তখন আমার ছোটবেলার স্মৃতি ভেসে ওঠে। ৫০ বছর আগে জাপানে রাস্তাঘাটে ভিখারি ছিল। গাছের নিচে বসে চুল, দাড়ি কাটতে দেখেছি। জাপানের সবাই ছিল ক্ষুধার্ত। রাস্তাঘাট ছিল জনসংখ্যার ভারে উপচে পড়া। অ্যাসফল্টের রাস্তা ছিল না। রাস্তায় চলত তোবড়ানো গাড়ি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর জাপান দারিদ্র্যসীমার নিচে স্থান পায়। জাপানিদের যথেষ্ট খাবার ছিল না। সবাই দারিদ্র্যময় জীবনযাপন করত। সেই দারিদ্র্য অবস্থা থেকে প্রত্যয়ী জাপানিরা উঠে দাঁড়িয়েছে। ইতোমধ্যে পৃথিবীর অতি-উন্নত অর্থনৈতিক সীমারেখায় এসে পৌঁছেছে। জাপানিরা পৃথিবীর অনেক মানুষের কাছ থেকে ‘অতি পরিশ্রমী’ হিসেবে বিদ্রুপ শুনেছে। কিন্তু দরিদ্র অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য নিজের সর্বশক্তি দিয়ে পরিশ্রম করে গেছে। তাদের কোনো কুণ্ঠাবোধ ছিল না। কাজই তাদের ধর্ম-কর্ম। কাজের ক্ষেত্রে কোনো ছোট-বড় চিন্তা তাদের নেই।

বাংলাদেশি মানুষরাও বড়ই কাজের মানুষ। এ দেশের মানুষ অলস অকর্মণ্য নয়। যুগ যুগ ধরেই এ দেশের মানুষ হাতের কাজ, কুটিরশিল্প এমনি নানা কাজ-কর্মে দেশ-বিদেশে সপ্রতিভ স্বাক্ষর রেখেছে। এ ধারা এখনো বহমান। এ দেশের সাধারণ মানুষের চাহিদা সামান্য। অল্পে তুষ্ট মানুষরা খেয়ে-পরে নিরাপদে বেঁচে থাকতে চায়। মানুষ কল-কারখানায়, মাঠে-ঘাটে কাজ করে দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে আলোচিত নাম। এশিয়ার পরবর্তী অর্থনৈতিক টাইগার হিসেবে বাংলাদেশের নাম এসেছে। বাংলাদেশ পারে, বাংলাদেশ পারবে। তলাবিহীন ঝুড়ির কালিমা কাটিয়ে আশার আলোয় আলোকিত বাংলাদেশ সারা বিশ্বকে প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখিয়ে দিচ্ছে আমরা বাঙালি, আমরাই পারি। কৃষি ও শিল্পবিপ্লবের সূত্রপাত করার মধ্য দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটালাইজেশন, উৎপাদন, রফতানি, দক্ষতা, নারীর ক্ষমতায়ন সর্বোপরি দেশের তরুণসমাজের মধ্যে সম্ভাবনার বাংলাদেশ নিয়ে আশার জাগরণ সৃষ্টি করতে পেরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের ব্যক্তি উদ্যোগ, সামাজিক উদ্যোগ, দেশের আপামর জনগণের মেধা, পরিশ্রম, সৃজনশীলতা, ধৈর্য ও সাহস দেশের উন্নয়ন ধারায় গতি সঞ্চার করেছে। তবে বলতেই হবে, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত যা কিছু অর্জন, তার অধিকাংশই দেশের সাধারণ মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফসল। বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নের মধ্যে বিশেষত খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বাংলার কৃষক এবং উৎপাদন ও রফতানিতে বাংলার শ্রমিকদের অসামান্য অবদানকে স্যালুট জানাতেই হয়। বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের ক্ষেত্রে প্রবাসী বাঙালিদের অনন্য অবদান রয়েছে। নারীর অগ্রযাত্রা অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল করতে নতুন আশাবাদ সৃষ্টি করেছে। তা ছাড়া ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের অবদান, পেশাজীবীসহ সর্বসাধারণের অনন্য অবদান দেশের সার্বিক উন্নয়নে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের উন্নয়নে ও সম্ভাবনার সবচেয়ে বেশি আশার জায়গাটি হচ্ছে তরুণসমাজ। প্রায় পাঁচ কোটি তরুণকে যোগ্যতা অনুসারে কাজ দিতে পারলে বাংলাদেশের চেহারা পাল্টে যাবে আগামী দশ বছরে।

বাংলাদেশের শিল্প বিকাশে দেশীয় উদ্যোক্তাদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিকূল পরিবেশ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যথেষ্ট সহনশীলভাবে দেশীয় শিল্প বিকাশের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা।

যদি কোনো দেশ উচ্চহারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চায়, তাহলে সে দেশে অবশ্যই বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কেননা, প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং সরকারের শিল্পবান্ধব ভূমিকার মধ্যে নিরিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। এ ক্ষেত্রে আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদের বিনিয়োগ নীতিকে দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ায় শিল্পায়নের জন্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানানোর পাশাপাশি দেশীয় শিল্প বিকাশকে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দেশীয় শিল্পের ভিত্তি শক্তিশালী করেন। যার ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঘাড় নাড়ালেও মালয়েশিয়ার উন্নয়ন ব্যাহত হয়নি। এ কথা কমবেশি সবারই জানা আছে, ১৯৫৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত মালয়েশিয়া ছিল দারিদ্র্যপীড়িত দেশ। মাহাথির মোহাম্মদের মন্ত্রীদের কাছে ব্যবসায়ী সমাজের সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রত্যেকের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যাপারে মনোযোগী হন। তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, আইনশৃঙ্খলার অস্বাভাবিকতায় কেউ যেন ভীত-সন্ত্রস্ত্র না হয়। বিনিয়োগকারী যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় না পড়েন। কর্মীদের উচ্ছৃঙ্খলতা ও দুর্নীতির কালো থাবা যেন উৎপাদন ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি না করে। বলা যায়, এই বলিষ্ঠ পদক্ষেপ মালয়েশিয়াকে বাণিজ্যবান্ধব রাষ্ট্রে পরিণত করে। ফলে দেখা গেছে, শুধু টিন ও রাবার রফতানিকারক দেশ মালয়েশিয়া মাত্র দুই দশকে ইলেকট্রনিক, ইস্পাত, যন্ত্রপাতি এমনকি মোটরগাড়ি রফতানিকারক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সরকারি মালিকানাধীন সংস্থাগুলোর বেসরকারীকরণ, বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের মাধ্যমে মালয়েশিয়াকে দ্রুত শিল্পায়নে সমৃদ্ধ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা দাতা সংস্থার পরামর্শ এড়িয়ে দেশের জন্য যা মঙ্গলকর তা-ই করেছেন মাহাথির মোহাম্মদ। তারই ফলে মালয়েশিয়া মাত্র দুই দশকে অনগ্রসরতার পাতাল থেকে সগর্বে আরোহণ করেছে অগ্রগতির শীর্ষ চূড়ায়।

আমাদের দেশেও শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে। আমাদের উদ্যমী শিল্প-উদ্যোক্তারা তাদের নিরলস প্রচেষ্টায় সম্পূর্ণ দেশীয় বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে ক্রমেই গ্রুপ অব কোম্পানিতে পরিণত করেছেন। মনে রাখতে হবে, শিল্পের মালিক উদ্যোক্তা হলেও শিল্পপ্রতিষ্ঠান কেবল নিজের সম্পদ নয়, এসব শিল্প উদ্যোগের সঙ্গে লাখো কোটি মানুষের কর্মসংস্থান ও জনগণের বিনিময় সম্পৃক্ততা রয়েছে। দেশ ও সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখার উদ্দেশ্য নিয়েই শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শুধু মালিক বা উদ্যোক্তারা নন, লাভবান হয় দেশের মানুষ, সমাজ এবং রাষ্ট্রও। সরকারকে ভাবতে হবে একজন বেসরকারি উদ্যোক্তা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ নিয়ে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে সচেষ্ট রয়েছেন। সরকারের নিয়মবিধির জাঁতাকলে তিনি যদি একটি উদ্যোগও বন্ধ রাখেন, তাহলে মানুষের কর্মসংস্থানের দায়িত্ব কে নেবে? সরকার রাজস্ব পাবেন কোত্থেকে? দেশের চাহিদা কীভাবে মিটবে? রফতানি আয় কীভাবে বাড়বে? এ কারণে দেশীয় শিল্প উদ্যোগগুলোকে অধিকতর সুবিধা দিয়ে এগিয়ে যেতে দিতে হবে। বেকার যুবসমাজকে কাজ না দিয়ে মাদককে না বলো স্লোগানে সংগীত কনসার্ট করলে লাভ হবে না। জঙ্গিবাদ নির্মূলের চেষ্টাও সফল হবে না। বরং তাদের কাজ দিয়ে মাদক কিংবা জঙ্গিবাদের পথ থেকে ফিরিয়ে আনার উপায় সৃষ্টি করাটাই উত্তম উপায়।

আকিরা জুকো বলেছিলেন, আপনারা বাংলাদেশি। আপনাদের ছোট, বড়, মাঝারিশিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ৫০ বছর পর আপনার প্রতিষ্ঠান পৃথিবীর উঁচু সারির প্রতিষ্ঠান হতে পারে। আপনাদের মধ্য থেকে যদি পৃথিবীর উঁচু সারির শিল্পপতি ব্যবস্থাপক একজনের পর একজন দাঁড়াতে থাকেন, তবে পৃথিবীতে নিশ্চয়ই বাংলাদেশ উন্নত অর্থনৈতিক দেশ হিসেবে স্থান লাভ করবে।’ আকিরা জুকোর সম্ভাবনার ইঙ্গিত ১৮ বছরের ব্যবধানে বাস্তবে প্রতিফলিত হয়েছে। উদ্যোগী ও প্রত্যয়ী মানুষটি জোরালো কণ্ঠে বলেছেন, ‘সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হবে’। আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে জনসংখ্যার আধিক্য যেমন আছে, তেমনি আছে প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য। দেশকে নিয়ে আমরা যতই হতাশা ব্যক্ত করি না কেন, উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আমাদের জনসংখ্যা ও সম্পদ কাজে লাগিয়ে সম্ভাবনার বাংলাদেশেরই ইঙ্গিত করছে প্রতিনিয়ত। পৃথিবীর কোনো উদ্যোগই একক প্রচেষ্টায় রাতারাতি সফলতা পায়নি। বাংলাদেশেও তা হবে না। সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন ও সহযোগিতায় তিলে তিলে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই অগ্রসর হতে হবে আমাদের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here